কলার উৎপাদন প্রযুক্তি

ট্রাইকোডারমা একটি উপকারী ছত্রাক
April 3, 2018
সীডলেস লেমন (বীজ বিহীন লেবু-কলম চারা)
July 10, 2018

জলবায়ু ও মাটি ঃউষ্ণ ও আর্র্দ্র আবহাওয়ায় কলা ভাল জন্মে। জৈবসার সমৃদ্ধ এবং পানি নিষ্কাশনের সুবিধাযুক্ত উঁচু জমি কলা চাষের জন্য নির্বাচন করা উত্তম।

জমি তৈরি ঃ বারবার চাষ দিয়ে জমি ভালভাবে তৈরী করে নিতে হয়। অমৃত সাগর কলার জন্য ২২ মি. দূরত্বে কাঠি পুঁতে সাকার রোপনের জায়গা চিহ্নিত করা হয়। কাঠিটিকে কেন্দ্র কওে ৪৫৪৫৪৫ সেমি. গর্ত খুড়তে হয়। এ সময় গর্তের উপরের মাটি আলাদা রেখে উপরের মাটির সাথে মিশিয়ে গর্তে ফেলতে হবে। এরপর মাটি দিয়ে গর্তটি সম্পূর্ণ ভরে ফেলতে হবে। মেহের সাগর কলার বেলায় ১.৮১.৮ মি. দূরত্বে রোপণ করা যেতে পারে। বিশেষ ক্ষেত্রে এর চেয়ে কম দূরত্বে (১.৫১.৫) বামুন জাতগুরো রোপণ করা চলে।
চারা রোপন ঃ গর্তে সার প্রয়োগের পর চারা রোপণ করতে হয়। সোর্ড সাকার রোপণ করাই উত্তম। প্রতি হেক্টরে ২২ মিটার দূরত্বে ২৫০০টি, ১.৮১.৮ মি. দূরত্বে ৩০৮৫টি ও ১.৫১.৫ দূরত্বে ৪৪৪০টি সাকারের প্রয়োজন হয়।

জাত ঃ বাংলাদেশে অমৃতসাগর, মেহেরসাগর, সবরী, চাম্পা, কবরী, জাহাজী, গ্যানাসুন্দরী ইত্যাদি জাতের কলা উৎপন্ন হয়।

রোপন সময় ঃ কলার চারা বছরে ৩ মৌসুমে রোপন করা যায়। মধ্য জানুয়ারি থেকে মধ্য মার্চ। মধ্য মার্চ থেকে মে এবং মধ্য সেপ্টেম্বর থেকে মধ্য নভেম্বর।

সার ঃ প্রতি গাছে নিম্বরূপে সার ব্যবহার করতে হবে।

সেচ ঃ শুকনো মৌসুমে ১৫-২০ দিন পর পর সেচের প্রয়োজন হয়। গাছ বৃদ্ধির প্রথম অবস্থায় বিশেষ করে রোপনের প্রথম চার মাস কলা বাগান আগাছামুক্ত রাখা খুব জরুরী। কলা বাগানের জমিতে যাতে পানি না জমে সেদিকে দৃষ্টি দেয়া দরকার। প্রয়োজন হলে পানি নিষ্কাশন করার জন্য নালা কেটে দিতে হবে।

আন্তঃ ফসল ঃ সাকার রোপনের প্রথম ৪-৫ মাস বলতে গেলে জমি ফাঁকাই থাকে। যদি সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে চারা রোপন করা হয় তবে কলা বাগানের মধ্যে আন্তঃ ফসল হিসাবে রবি মৌসুমের সবজি চাষ করা যেতে পারে। তবে এসব আন্তঃ ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত সার দিতে হবে। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি (মাঘ) মাসে সাকার রোপণকরলের আন্তঃ ফসল হিসাবে কুমড়া, মিষ্টি কুমড়া, শশা ইত্যাদি বাড়তি ফসল উৎপাদন করা যায়।

ফলের যত্ন ঃ গাছে থোড় আসার পরপরই গাছে যাতে বাতাসে ভেঙ্গে না যায় সেজন্য বাঁশের খুঁটি দিয়ে বাতাসের বিপরীত দিক থেকে গাছে ঠেস দেয়া খুবই জরুরী। থোড় থেকে কলা বের হওয়ার আগেই গোটা থোড় স্বচ্ছ বা সবুজ পলিব্যাগ দিয়ে ঢেকে দেয়া দরকার।
পোকামাকড় ও রোগ দমন

কলার পাতা ও ফলের বিটল পোকা ঃ কলার পাতা ও ফলের বিটল পোকা কলার কচি পাতার সবুজ অংশ নষ্ট করে। ফলে অসংখ্য দাগের সৃষ্টি হয়। কলা বের হওয়ার সময় হলে পোকা মোচার মধ্যে ঢুকে কচি কলার রস খায়। ফলে কলার গায়ে বসন্ত রোগের দাগের মত দাগ হয়। এ পোকা দমনে নিম্নলিখিত ব্যবস্থা গ্রহণ করলে ভাল ফল পাওয়া যায়।
* পোকা-আক্রান্ত মাঠে বার বার কলা চাষ না করা।
* কলার মোচা বের হওয়ার সময় ছিদ্রবিশিষ্ট পলিব্যগ ব্যবহার করে এ পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
* প্রতি ১ লিটার পানিতে ১ গ্রাম সেভিন ৮৫ ডব্লিউ পি অথবা ম্যালথিয়ন
অথবা লিবাসিড ৫০ ইসি ২ মিলি মিলিয়ে ১৫ দিন পর পর গাছের পাতার উপরে ছিটাতে হবে।

পানামা রোগ ঃ এটি একটি ছত্রাক জাতীয় মারাত্মক রোগ। এ রোগের আক্রমণে প্রথমে বয়স্ক পাতার কিনারা হলুদ হয়ে এবং পরে কচি পাতাও হলুদ রং ধারণ করে। পরবর্তীতে পাতা বোটার কাছে ভেঙ্গে গাছের চতুর্দিকে ঝুলে থাকে এবং মরে যায়। কিন্তু সবচেয়ে কচি পাতাটি গাছের মাথায় খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। অবশেষে গাছ মরে যায়। কোন কোন সময় লম্বালম্বি ভাবে ফেটেও যায়। এ রোগ দমনে নিম্নলিখিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পার।
* আক্রান্ত গাছ গোড়াসহ উঠিয়ে পুড়ে ফেলতে হবে।
* আক্রান্ত গাছের সাকার চারা হিসাবে ব্যবহার না করা।
* পানামা রোগ প্রতিরোধকারী চম্পা জাত ব্যবহার করা।

বানচি-টপ ভাইরাস রোগ ঃ এ রোগের আক্রমণে গাছের পাতা শুচ্ছাকারে বের হয়। পাতা আকারে খাটো, অপ্রশস্ত এবং উপরের দিকে খাড়া থাকে। কচি গাছের কিনারা উপরের দিকে বাকানো এবং সামান্য হলুদ রংয়ের হয়। অনেক সময় পাতার মধ্যে শিরা ও বোটায় ঘন সবুজ দাগ দেখা যায়।

নিম্মোক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে এ রোগ দমনে রাখা যায় ঃ ভাইরাস বহনকারী এফিড দমনে সুমিথিয়ন (২ মি.লি/লিটার পানিতে মিশিয়ে) প্রয়োগ করা যেতে পারে। আক্রান্ত গাছ গোড়াসহ উঠিয়ে পুড়ে ফেলতে হবে। বানচি-টপ প্রতিরোধকারী চাম্পা জাত ব্যবহার করা।

সিগাটেকা রোগ ঃ এ রোগের আক্রমণে প্রাথমিকভাবে ৩য় বা ৪র্থ পাতায় ছোট ছোট হলুদ দাগ দেখা যায়। ক্রমশ দাগগুলো বড় হয় এবং বাদামি রং ধারণ করে। এভাবে একাধিক দাগ মিলে বড় দাগের সৃষ্টি করে এবং তখন পাতা পুড়ে যাওয়ার মত দেখায়।
নিম্মোক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে এ রোগ দমনে রাখা যায় ঃ আক্রান্ত গাছের পাতা পুড়ে ফেলতে হবে। প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি টিল্ট-২৫০ ইসি অথবা ১ গ্রাম ব্যাভিষ্টিন মিশিয়ে ১৫ দিন পর পর গাছে ছিটাতে হবে।

ফলন ঃ রোপনের পর ১১-১৫ মাসের মধ্যেই সাধারণত সবজাতের কলা পরিপক্ক হয়ে থাকে। বাংলাদেশে অমৃত সাগর প্রতি বিঘা ফলন ২-২.৫ টন।

মুড়ি ফসল ঃ সাকার রোটনের প্রথম ৪-৫ মাস সাকার বের হওয়া শুরুকরে। কলা গাছে থোড় বের হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ১৫ দিন পর পর মাটির ৫ সে.মি. উপরে ধারালো হাসুয়া দিয়ে সবগুলো সাকার কেটে ফেলে দিতে হবে। থোড় বা ফুল হবার পর পছন্দমতো জায়গায় কোন একটি সাকার বাড়তে দেয়া উচিত যেটি মুড়ি ফসল হিসেবে পরবর্তীতে বেড়ে উঠবে ও ফল দিবে। মুড়ি ফসলের জন্য সমান বয়সের সাকার নির্বাচন করতে হবে।

Comments are closed.